একাদশী সংক্রান্ত কিছু বিভ্রান্তির নিরসন

‼️‼️#একাদশী সংক্রান্ত কিছু বিভ্রান্তির নিরসন‼️‼️
🔷#বেদে কোথায় উপবাস থাকতে বলেছে⁉️
🔷 একাদশীতে কি কি খাওয়া যায়? কোন শাস্ত্রে #অনুকল্প খাওয়ার বিধান আছে⁉️
🔷 #সধবা নারীরা কি একাদশী করতে পারবে⁉️
🔷 কৃষ্ণপক্ষের একাদশী থাকবো নাকি শুক্লপক্ষের⁉️
🔷 একাদশীর উপবাসে কি #ওষুধ খাওয়া যায়⁉️
==========================================
একাদশীতে অনুকল্প প্রসাদ পাওয়ার বিধান আমাদের বৈদিক শাস্ত্রসমূহের মধ্যে বিস্তারিত ভাবে রয়েছে। একাদশীতে উপবাস করার শাস্ত্রীয় বিধান হলো- যারা সারা দিনরাত ধরে নির্জলা উপবাস করার মতো শারীরিক সামর্থ রয়েছে, তারা নির্জলা উপবাস পালন করবেন। কিন্তু কলিহত জীব আমরা, আমাদের সকলের পক্ষে নির্জলা উপবাস করা সম্ভব হয় না। তাই ভগবান কৃপাবশত আমাদের জন্য একাদশীর দিনে অনুকল্প প্রসাদ গ্রহণের বিধান দিয়েছেন বৈদিক শাস্ত্র সমূহে। যারা নির্জলা উপবাস করতে অসমর্থ, শাস্ত্রে তাদের জল পান করে ব্রত করার বিধান দেওয়া হয়েছে, একে বলে সজলা ব্রত। যারা সজলা ব্রত করতেও অসমর্থ, তাদের জন্য ভগবান বিধান দিয়েছেন- কেউ চাইলে ভগবানকে ফল মূল কন্দ সরাসরি কিংবা রান্না করে ভগবানকে নিবেদন করে সে অনুকল্প প্রসাদ পেতে পারেন। একে বলে সফলা ব্রত। তবে কোন মতেই রবিশস্য ভোজন করা যাবে না একাদশীর ব্রতে। একাদশীর দিনে রবিশস্য ভোজন সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
এবার আসুন বৈদিক শাস্ত্র সমূহ হতে দেখে নিই উক্ত বিধির সপক্ষে প্রমাণসমূহ-
================================

বেদে কোথায় উপবাসের বিধান আছে?

================================
যদনাশ্বানুপবসেৎ ক্ষোধুকঃ স্যাদ্যষ্বীয়াদ্রদ্রোহস্য পশূনভি মন্যেত। অপোহশ্মাতি। তন্নেবাশিতং নেবানশিতং ন ক্ষোধুকো ভবাতি নাস্র রুদ্রঃ পশূনভি মন্যতে। বজ্ৰো বৈ যজ্ঞঃ ক্ষুৎ খলু বৈ মনুষ্যস্য ভ্রাতৃব্যো যদনাশ্বানুপবসতি বজ্রেণৈব সাক্ষাৎক্ষুধং ভ্রাতৃব্যং হন্তি ॥
বঙ্গানুবাদ:
উপবাসে ক্ষুধা বৃদ্ধি পায় এবং ক্ষুধাগ্নি জীবের ক্ষতি সাধন করে । যদি ক্ষুধা অসহনীয় হয় তবে #জলপান করবে। জলপানে ভোজন হয়, আবার হয়না। যজ্ঞ বজ্রসদৃশ, ক্ষুধা মানুষের শত্রু। না খেয়ে উপবাস করলে যজ্ঞরূপ বজ্র তার ক্ষুধারূপ শত্রুকে বিনাশ করে।
#বেদে বলা হয়েছে, ঈশ্বরের প্রীতির জন্য অনশন(উপবাস) ব্রত করা সকলেরই কর্তব্য।
তমেতং বেদান বচনেন ব্রাহ্মণা বিবিদিষন্তি
যজ্ঞেন দানেন তপসাংনাশকেনৈতমেব বিদিত্বা মুনির্ভবতি।
[#বৃহদারণ্যক ঊপনিষদ ৪/৪/২২]
বঙ্গানুবাদঃ
বেদবচন, যজ্ঞ, দান, তপস্যা ও অনশন(উপবাস ব্রত) দ্বারা ব্রহ্মবিদগণ পরমেশ্বরকে জানিতে চাহেন। ইহাকে জানিয়াই মানুষ মুনি হয়।
===========================================

 একাদশীতে অনুকল্প প্রসাদ পাওয়ার বিধান কোন শাস্ত্রে আছে?

===========================================
শ্রীব্রহ্মবৈবর্ত মহাপুরাণে দেবর্ষি নারদ বলেছেন-
ন ভোক্তব্যং ন ভোক্তব্যং ন ভোক্তব্যঞ্চ নারদ।
গৃহিভির্ব্রাহ্মনৈরন্নং সম্প্রাপ্তে হরিবাসরে ॥ ৮
গৃহী শৈবশ্চ শাক্তশ্চ ব্রাহ্মণো জ্ঞানদুর্ব্বলঃ।
প্রয়াতি কালসূত্রঞ্চ ভুক্ত্বা চ হরিবাসরে ॥ ৯
কৃমিভিঃ শালমানৈশ্চ ভক্ষিতস্তত্র তিষ্ঠতি।
বিণ্মূত্রভোজনং কৃত্বা যাবদিন্দ্ৰাশ্চতুৰ্দ্দশ ॥ ১০
জন্মাষ্টমীদিনে চৈব শ্রীরামনবমীদিনে।
শিবরাত্রৌ চ যো ভুঙেক্ত সোঽপি দ্বিগুণপাতকীয়।। উপবাসাসমৰ্থশ্চ ফলমূলজলং পিবেৎ।
নষ্টে শরীরে স ভবেদন্যথা চাত্মঘাতকঃ ॥ ১২
সকৃদ্ ভুঙেক্ত হবিষ্যান্নং বিষ্ণোনৈবেদ্যমেব চ।
ন ভবেৎ প্রত্যবায়ী স চোপবাসফলং লভেৎ ॥১৩
[ #শ্রীব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, ব্রহ্মখন্ড, ২৭। ৮-১৩ ]
বঙ্গানুবাদঃ
গৃহী, ব্রাহ্মণ, শৈব, শাক্ত অথবা বৈষ্ণব যাহা কেন হউন না একাদশীতে অন্নাহার করিলে, কালসূত্রে গমন করেন এবং সেই স্থানে শালবৃক্ষ প্রমাণ কৃমিগণকর্তৃক ভক্ষিত ও বিষ্টামূত্রভোজী হইয়া চতুর্দ্দশ ইন্দ্র পর্যন্ত যন্ত্রণা ভোগ করেন। একাদশী ছাড়াও জন্মাষ্টমী, শ্রীরামনবমী ও শিবরাত্রি দিবসে যিনি ভোজন করেন, তিনি ইহা অপেক্ষা দ্বিগুণত্তর পাতকী হন। কিন্তু উপবাস জন্য শরীর নষ্ট হইলে, আত্মহত্যার পাপ হয়, তাই (নির্জলা) উপবাসে অসমর্থ হইলে, #ফল_মূল ভোজন ও #জল পান করিবেন। অথবা একবার বিষ্ণুর নিবেদিত #হবিষ্যান্ন ভোজন করিবেন, তাহাতে কিছুমাত্র প্রত্যবায় নাই বরং উপবাসের ফল লাভ করিবেন।
গর্গসংহিতাতে গর্গমুনি বলেছেন-
অন্নান্ সর্ব্বান বৰ্জ্জয়িত্বা গৌধূমাদ্যাম্নৃপেশ্বর।
একাদশ্যাং প্রকুর্ব্বীত ফলাহার মুদা নরঃ ॥
[ #গর্গসংহিতা, অধ্যায় ৬১, শ্লোক- ৫০ ]
বঙ্গানুবাদ:
হে নৃপবর! গোধূমাদি( গম,আটা, ময়দা সহ অন্যান্য) সর্ববিধ অন্ন বর্জন করিয়া মানব একাদশীতে সানন্দে অন্ততঃ ফলাহার করিবে।
মহাভারতে বিদূর ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছেন-
অষ্টৈতান্যব্ৰতঘ্নানি আপো মূলং ফলং পয়ঃ।
হরির্ব্রাহ্মণকাম্যা চ গুরোর্বচনমৌষধম।
[ #মহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৩৯।৭০ ]
বঙ্গানুবাদ:
#ফল, #মূল, #ক্ষীর, #ঘৃত, ব্রাহ্মণ কামনা, গুরুর বচন ও ঔষধ এই আটটি ব্রত-নাশক নহে।
এছাড়াও পদ্মপুরাণেও মাতা একাদশী শ্রীহরির নিকট প্রার্থনা করেছেন, কেউ যদি অনুকল্প প্রসাদ পেয়েও একাদশীর উপবাস করে তবে শ্রীহরি যেন তাকে বিত্ত, ধর্ম ও মোক্ষ দান করেন।
রেফারেন্স:
মামুপোষ্যন্তি যে ভক্ত্যা তব ভক্ত্যা জনার্দ্দন।
সর্ব্বসিদ্ধির্ভবেত্তেষাং যদি তুষ্টোহসি মে প্রভো।।
উপবাসঞ্চ নক্তঞ্চ একভক্তং করোতি চ।
তন্য বিত্তঞ্চ ধৰ্ম্মঞ্চ মোক্ষং বৈ দেহি মাধব।
[ #পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৩৮।১০০-১০১, একাদশীদেবী উক্তি ]
অনুবাদঃ
দেবী একাদশী শ্রীহরিকে বললেন, ‘ হে জনার্দ্দন! আপনি যদি আমার প্রতি তুষ্ট হইয়া থাকেন তবে আপনার প্রতি ভক্তি করিয়া যাহারা আমার এই একাদশীর দিনে উপবাস করিবে তাহাদের যেন সর্ব্বসিদ্ধি হয়। যে ব্যক্তি (নির্জলা) উপবাস, নক্তাশন বা একাহার করিবে, হে মাধব! তাহাকে আপনি বিত্ত,ধর্ম্ম ও মোক্ষ দান করিবেন।
অতএব একাদশী নির্জলা, সজলা ও সফলা যেকোন ভাবেই থাকা সম্ভব। ব্রতী তার সামর্থ অনুসারে নির্ণয় করবেন তিনি কি রূপে ব্রত পালন করবেন। তিনি চাইলে নির্জলাও করতে পারেন, আবার চাইলে ভগবানকে নিবেদিত (রবিশস্য বিহীন) অনুকল্প প্রসাদও পেতে পারেন।
==========================================

প্রশ্ন: একাদশীতে সবজি খাওয়ার বিধান শাস্ত্রে কোথায় আছে

==========================================
উত্তরঃ
প্রথমে বুঝতে হবে সবজি বলতে কি বুঝায়। আমরা সাধারণত সবজি হিসেবে যা খাই ( যেমনঃ লাউ, পটল, ঝিঙ্গা, ঢেড়স ইত্যাদি) এগুলো আসলে ফল। পুষ্প নিষেকের মাধ্যমে উদ্ভিদের ফল হয়। যে সকল ফলের সেলুলোজ আমরা সরাসরি হজম করতে পারি না, তাদেরকে আমরা রান্ন করে খাই, তাই এ জাতীয় ফলকে আমরা সবজি হিসেবে চিনি। এছাড়া বিভিন্ন রকম কন্দ ( যেমনঃ বাদাম, আলু, মিষ্টি আলু, গাজর, মূলা, কচু ইত্যাদি) -ও আমরা রান্না করে খাই, তাই এদেরও সবজি বলে। অর্থাৎ, উদ্ভিদের ফুল, ফল, পত্র, কন্দ যা আমরা রান্না করে খাই, তা সবজি হিসেবে পরিচিত।
শাস্ত্রে আমাদের (রবিশস্য ভিন্ন) ফল, মূল, কন্দ সবই একাদশীর দিন গ্রহণের অনুমোদন দিয়েছে। চলুন দেখে নেওয়া যাক-
গর্গসংহিতা:
অন্নান্ সর্ব্বান বৰ্জ্জয়িত্বা গৌধূমাদ্যাম্নৃপেশ্বর।
একাদশ্যাং প্রকুর্ব্বীত ফলাহার মুদা নরঃ ॥ ৫০
অন্নং ভুঞ্জতি যো রাজন্নেকাদশ্যাং নরাধমঃ।
ইহ লোকে স চান্ডালো মৃতঃ প্রাপ্নোতি দুর্গতিম্
দধি দুগ্ধং তথা মিষ্টং কূটং কর্কটিকাং তথা।
বাস্তূকং পদ্মমূলঞ্চ রসালং জানকীফলম্ ॥ ৫২
গঙ্গাফলং পত্রনিম্বুং দাড়িম্বঞ্চ বিশেষতঃ ।
শৃঙ্গাটকং নাগরঙ্গং সৈন্ধবং কদলীফলম্ ॥ ৫৩
আম্রাতকং চার্দ্রকঞ্চ তুলঞ্চ বদরীফলম্ ।
জম্বুফল্মামলকং পটোলং ত্রিকুশ তথা ॥ ৫৪
রতালুং শর্করাকন্দমিক্ষুদণ্ডঃ তথৈব চ।
দ্রাক্ষাদীনি হি চন্যানি পবিত্রঞ্চ ফলং তথা ॥৫৫
একবারঞ্চ রাজেন্দ্র ভোক্তব্যং হরিবাসরে।
তৃতীয়ে প্রহরেঽতীতে প্রস্থস্য চ পলস্য চ। ৫৬
[ গর্গসংহিতা, অধ্যায় ৬১, শ্লোক- ৫০-৫৬ ]
বঙ্গানুবাদঃ
হে নৃপবর! গোধূমাদি অর্থাৎ গম, আটা, ময়দা ইত্যাদি সর্ববিধ অন্ন বর্জন করিয়া মানব একাদশীতে সানন্দে অন্ততঃ ফলাহার করিবে। হে রাজন! যে নরাধম একাদশীতে অন্ন ভোজন করে, সে ইহলোকে চণ্ডালতুল্য ও পরলোকে দুর্গতি ভাজন হয়। হে রাজন! একাদশীতে দধি, দুগ্ধ, মিষ্ট, কূট ও কর্কটিকা এবং বাস্তূক, পদ্ম- মূল, আম, জানকীফল, গঙ্গাফল, পত্রনিম্বু, দাড়িম, শৃঙ্গাটক, নাগরঙ্গ, সৈদ্ধব, কদলী,আম্রাতক, আর্দ্রক, তুল, বদরী, জম্বু, আমলক, #পটোল, #ত্রিকুশ, রতালু- আলু, #শর্করাকন্দ– মিষ্টি আলু, ইক্ষুদন্ড এবং দ্রাক্ষাদি অন্যান্য পবিত্র #ফল মূল একবার ভক্ষণ করিবে। আবার বেলা তৃতীয় প্রহর অতীত হইলে প্রস্থ বা পলাদি পরিমিত দ্রব্যের দ্বিজকে দিয়া অর্দ্ধ নিজে ভোজন করিতে পারিবে।
[ পোস্টের প্রথমাংশে ইতোপূর্বে এ সংক্রান্ত আরো রেফারেন্স দেখানো হয়েছে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, মহাভারত থেকে ]
–——————————————

প্রশ্ন: একাদশীতে রবিশস্য বর্জন করার কথা কোন শাস্ত্রে আছে?

–—————————————–
উত্তরঃ
শুধু একাদশীই নয়, সমস্ত প্রকার উপবাসে রবিশস্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। একাদশীতে পাঁচ ধরনের শস্য জাতীয় খাওয়ার নিষিদ্ধ। শস্য কাকে বলে? বৈদিক শাস্ত্রে শস্য হল যাদের ফল(ফলের শাঁসালো অংশ mesocarp) ও বীজ(endocarp) কে আলাদা করা যায়না। যেমন সমস্ত ধরনের চাল, ডাল, ভুট্টা, গম, সরিষা এগুলি হল শস্য।
অন্নান্ সর্ব্বান বৰ্জ্জয়িত্বা গৌধূমাদ্যাম্নৃপেশ্বর।
একাদশ্যাং প্রকুর্ব্বীত ফলাহার মুদা নরঃ ॥
[ গর্গসংহিতা, অধ্যায় ৬১, শ্লোক- ৫০ ]
বঙ্গানুবাদ:
হে নৃপবর! গোধূমাদি( গম,আটা, ময়দা এবং অনুরূপ) সর্ববিধ অন্ন(রবিশস্য) বর্জন করিয়া মানব একাদশীতে সানন্দে অন্ততঃ ফলাহার করিবে।
–———————————–

প্রশ্ন: ব্রত রেখে কি ওষুধ খাওয়া যায়?

–———————————–
উত্তরঃ
মহাভারতের উদ্যোগপর্বে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ওষুধ গ্রহণে উপবাস ভঙ্গ হয় না।
অষ্টৈতান্যব্ৰতঘ্নানি আপো মূলং ফলং পয়ঃ।
হরির্ব্রাহ্মণকাম্যা চ গুরোর্বচনমৌষধম।
[ মহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ৩৯।৭০ ]
বঙ্গানুবাদ:
ফল, মূল, ক্ষীর, ঘৃত, ব্রাহ্মণ কামনা, গুরুর বচন ও #ঔষধ এই আটটি ব্রত-নাশক নহে।
উপরোক্ত আলোচনা হতে আমরা জানলাম, একাদশীতে নির্জলা উপবাস রাখতে অসমর্থবান ব্যক্তি চাইলে অনুকল্প প্রসাদ পেয়ে একাদশী ব্রত করতে পারেন। একাদশীর দিন সামর্থ অনুসারে ব্রত করে বেশি বেশি কৃষ্ণভাবনাময় থাকার মাধ্যমে আমরা নিজেদের জীবনকে ধন্য করতে পারি। বেদে তাই বলা হচ্ছে, যিনি ভগবানের প্রীতার্থে উপবাস ব্রত করেন, তিনি নিশ্চয় জ্ঞানী।
————————————————————-

একাদশীতে শুক্ল ও কৃষ্ণপক্ষের পার্থক্য আছে?

—————————————————————–
একাদশী শুক্ল ও কৃষ্ণ যেটাই হোক, সব একাদশীতে ভেদ জ্ঞান বর্জনীয়। উভয় একাদশীই একই।
শ্রীকৃষ্ণ বললেন,”হে পার্থ! একাদশী তিথি শুভ তিথি, এটি উভয় পক্ষেই সমান। একাদশী শুক্লা বা কৃষ্ণা- এরূপ বিভেদ করিবে না। সমস্ত ব্রতকারীর পক্ষেই ঈদৃশ ভেদজ্ঞান বর্জ্জনীয়। উভয় পক্ষে একই একাদশী তিথি জানিবে।”
[ #পদ্মপুরাণ, উত্তর, ৩৮/১০৮]
একই শ্লোক পদ্মপুরাণ, যোগত্রিয়াসার, ২২।৫৮-৫৯ এ বিদ্যামান।
“শুক্লা বা কৃষ্ণা একাদশীর বিশেষ কি বলিব, একাদশী মাত্রেই ভোজন বর্জ্জনীয়। সকল বর্ণ ও সকল আশ্রম-সকলেরই একাদশী শ্রেষ্ঠ উপাস্য।”
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ২৩৪।১২ ]
——————————-=====================

সধবার একাদশী ব্রতের বিধান কোন শাস্ত্রে আছে

[১৪ খানা শাস্ত্রীয় প্রমাণ]
——————————–=====================
(১)
ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রণাঞ্চৈব যোষিতাম্।
মোক্ষদং কূর্ব্বতাং ভক্ত্যা বিষ্ণো:প্রিয়তরং দ্বিজাঃ।।
[ বৃহন্নারদীয় পুরাণ, অধ্যায়-২১ শ্লোক-২ ]
অনুবাদ:
ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য,শুদ্র এবং বিবাহিত স্ত্রীলোক – ইহাদিগের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি হউক, ভক্তি পূর্ব্বক একাদশী ব্রত পালন করে মুক্তি লাভ করতে পারে।
(২)
পতিসহিতা যা যোষিৎ করোতি হরিবাসরম্ ।
সুপুত্ৰা স্বামিসুভগা যাতি প্রেত্য হরের্গৃহম॥ ৭৬
যো যচ্ছতি হরেরগ্রে প্রদীপং ভক্তিভাবতঃ।
হরের্দিনে দ্বিজশ্রেষ্ঠ পুণ্যসঙ্গ্যা ন বিদ্যতে ॥৭৭
যাঙ্গনা ভর্ত্তৃসহিতা কুরুতে জাগরং হরেঃ।
হরের্নিকেতনে তিষ্ঠেচ্চিরং পত্যা সহ দ্বিজ ॥৭৮
[ পদ্মপুরাণ, স্বর্গখন্ড, অধ্যায় ৪৪, শ্লোক- ৭৬-৭৮ ]
বঙ্গানুবাদঃ
যে স্ত্রী পতি সহ একাদশীব্রত করে, সে সুপুত্রা স্বামি-সুভাগা হয়, মরণান্তে হরিগৃহ বৈকুন্ঠে যায়। দ্বিজ শ্রেষ্ঠ! একাদশীতে ভক্তিভাবে যে জন হরির অগ্রে প্রদীপ দান করে, তাহার পুণ্যের সংখ্যা নাই অর্থাৎ অগণিত পুণ্য লাভ করে । আর যে স্ত্রী স্বামীর সহিত একাদশীতে রাত্রি জাগরণ করে, সে চিত্রকাল পতি সহ হরির নিকেতনে বাস করে।
(৩)
যা নারী স্বামীসহিতা কুর্য্যাচ্চ হরিবাসরম।
সুপুত্রা ভর্ত্তসুভগা ভবেৎ সা প্রতিজন্মানি।।
[ পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মখন্ড, ৫।১৯ ]
বঙ্গানুবাদঃ
যে নারী স্বামীর সাথে একাদশীব্রত করে, সে জন্মে জন্মে সপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়।
(৪)
যা নারী ভর্ত্তৃসহিতা করোত্যেকাদশীব্রতম্।
সুপ্ৰজা স্বামিসুভগা সা ভবেৎ প্রতিজন্মনি।
স্বামিনা সহ যা নারী কুরুতে জাগরং হরেঃ।
সা তিষ্ঠেদ্বিষ্ণুভবনে চিরং ভর্ত্রা সহ দ্বিজ ।।
[ পদ্মপুরাণ, ত্রিয়াযোগসারঃ অধ্যায়-২২ শ্লোক- ১০৫ ]
বঙ্গানুবাদঃ
যে নারী স্বামীর সাথে একাদশীব্রত করে, সে জন্মে জন্মে সুপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়। আর যে নারী স্বামীর সঙ্গে জাগরানুষ্ঠান করে, সে স্বামীর সাথে সুচিরকাল বৈকুন্ঠধামে অবস্থান করে।
(৫)
দুর্ভাগা যা করোত্যেনাং সা স্ত্রী সৌভাগ্যমাপ্নুয়াৎ।
লোকানাঞ্চৈব সর্ব্বোষাং ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী।।
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪৮।৪ ]
বঙ্গানুবাদঃ
কোন দুর্ভাগা #স্ত্রী যদি একাদশী ব্রত আচরণ করেন, তিনি সৌভাগ্য লাভ করেন। এই একাদশী ব্রত সর্বলোকের ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী, সর্ব্বপাপহারিণী ও গর্ভবাসনিবারিণী।
(৬)
সপুত্রশ্চ সভাৰ্য্যশ্চ স্বজনৈৰ্ভক্তিসংযুতঃ।
একাদশ্যামুপবসেৎ পক্ষয়োরভয়োরপি ॥
[ বিষ্ণুধর্মোত্তর, হ.ভ.বি., ১২।৪৭ ]
বঙ্গানুবাদঃ
পুত্র, ভার্যা (পত্নী) ও স্বজনবর্গের সহিত ভক্তিযুক্ত হয়ে উভয়পক্ষের একাদশীতে উপবাস কর্তব্য।”
(৭)
আরিরাধয়িষুঃ কৃষ্ণং মহিষ্যা তুল্যশীলয়া ।
যুক্তঃ সংবৎসরং বীরো দধার দ্বাদশীব্রতম্ ॥
[ শ্রীমদ্ভাগবতম ৯।৪।২৯ ]
অনুবাদ:
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার জন্য অম্বরীষ মহারাজ তারই মতো গুণবতী #স্ত্রী সহ এক বৎসর কাল যাবৎ একাদশী এবং দ্বাদশীব্রত পালন করেছিলেন।
(৮)
দেবশর্ম্মার শিষ্য চন্দ্রের পত্নী গুণবতী আজীবন অর্থাৎ বিবাহের পূর্বে ও পরে সর্বদাই একাদশীব্রত ও কার্তিকমাস ব্রত করেছিলেন। যার পুণ্যপ্রভাবে তিনি মৃত্যুর পর বিষ্ণুলোকে গমন করেন এবং পরজন্মে সত্যভামা হয়ে কৃষ্ণপত্নী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন।
ব্রতদ্বয়ং তয়া সম্যগাজন্মমরণানৎ কৃতম।
একাদশীব্রতং সম্যক সেবনং কার্ত্তিককস্য চ।।
[ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, কার্ত্তিকমাসমাহাত্ম্যম, ১৩।১২ ]
বঙ্গানুবাদঃ
শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে বললেন, ‘চন্দ্রের পত্নী গুণবতী জন্ম হইতে মরণ পর্য্যন্ত একাদশী ব্রত ও কার্ত্তিক মাস ব্রত – এ দুই ব্রত সম্যকরূপে আচরণ করেছিলেন।’
(৯)
শ্রীনারদ উবাচ।
ইতি রাধামুখাচ্ছুত্বা যজ্ঞসীতাশ্চ গোপিকাঃ।
একাদশীব্রত চক্রবিধিবৎ কৃষ্ণলালসাঃ।।২৩
একাদশীদিনেনাপি প্রসন্নঃ শ্রীহরিঃ স্বয়ম।
মার্গশীর্ষে পূর্ণিমায়াং রাসং তাতিশ্চকার হ।।২৪
[ গর্গসংহিতা, মাধুর্য্যখন্ড, অধ্যায় ৯, শ্লোক ২৩-২৪, নারদ উক্তি ]
বঙ্গানুবাদঃ
নারদ বলিলেন,”যজ্ঞসীতা গোপীগণ রাধার মুখে একাদশী মাহাত্ম্য শুণে কৃষ্ণপ্রাপ্তির জন্য যথাবিধি একাদশী ব্রত করেন ; তাঁদের একাদশী ব্রত ফলে স্বয়ং গোপবালক হরি প্রসন্ন হয়ে অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমায় তাঁহাদের সহিত রাসনৃত্য করেছিলেন।”
(১০)
শ্রীকৃষ্ণ উবাচ।
শৃণু রাজন যথা বৃত্তং দৃষ্টং তৎকথয়ামি তে ।
মর্ত্যলােকে পুরা হাসীদব্ৰাহ্মণ্যেকা চ ভারত
ব্রতচৰ্য্যারুতা নিত্যং দেবপূজারতা সদা। ২৩
মাসোপবাসনিরতা মম ভক্তা চ সৰ্ব্বদা।
কৃষ্ণোপবাসসংযুক্তা মম পূজাপরায়ণ।। ২৪
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪২। ২২-২৪ ]
বঙ্গানুবাদঃ
শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন,–রাজন! শ্রবণ করুন, বৃত্তান্ত বলিতেছি- হে পার্থিব যুধিষ্ঠির! পুরাকালে মর্ত্যলোকে ব্রতচর্য্যানিরতা, নিত্য
দেবপূজা পরায়ণ এক #ব্রাহ্মণী ছিলেন। তিনি আমার নিত্যভক্তা, মাসােপবাসে নিয়তা, কৃষ্ণপ্রীত্যৰ্থ উপবাস পরায়ণা এবং মদীয় পূজায় একান্ত অনুরক্তা।
(১১)
দেবীনামুপদেশেন ষটতিলায়া ব্রতং কৃতম্ ।
মানুষ্যা সত্যব্রতয়া ভুক্তিমুক্তিফলপ্রদম।
রূপকান্তিসমাযুক্তা ক্ষণেন সমবাপ সা॥ ৪৬
ধনং ধান্যঞ্চ বস্ত্রাদি সুবর্ণং রৌপ্যমেব চ।
ভবনং সর্বসম্পন্ং ষটতিলায়াঃ প্রভাবতঃ ॥৪৭
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪২। ৪৫-৪৭ ]
বঙ্গানুবাদঃ
#দেবপত্নীগণের উপদেশে তাপসী মানুষী ভুক্তিমুক্তিফলপ্ৰদ ষটতিলা একাদশী ব্ৰত সম্পাদন করিলেন। তাহাতে সেই তাপসী ক্ষণমধ্যে রূপলাবণ্যবতী হইয়া ধন, ধান্য, বস্ত্র, সুবর্ণ ও রৌপ্য প্রাপ্ত হইলেন। ষটতিলা একাদশী ব্রতের প্রভাবে তাপসীর ভবন সর্বসম্পন্ন হইল।
(১২)
সাপ্যৈবং মঞ্জুঘোষা চ কৃত্বৈতদব্রতমুত্তমম্।
পিশাচত্বাদ্বিনির্ম্মুক্তা পাপমোচনিকাব্রতাৎ।
দিব্যরূপধরা সা বৈ গতা নাকে বরাপ্সরাঃ।।
[ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায়-৪৬।৪৬ ]
বঙ্গানুবাদঃ
অপ্সরা মঞ্জুঘোষাও উক্ত উত্তম একাদশী ব্রত অনুষ্ঠান পালনে পিশাচত্ব হইতে মুক্ত হইল। পাপমোচনী একাদশী ব্রতের প্রভাবে সে দিব্যরূপ ধারনপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিলো।
(১৩)
ব্রাহ্মণ্যৈ দেবপত্নীভিদত্তমেকাদশীব্রতম্।
তেন লেভে স্বৰ্গসৌখ্যং ধনধান্তঞ্চ মানুষী।।
[ গর্গসংহিতা, মাধুর্য্যখন্ড, অধ্যায় ৯, শ্লোক-৭, রাধা উক্তি ]
বঙ্গানুবাদঃ
শ্রীমতি রাধিকা গোপীকাদের বললেন, “একদা দেবপত্নীগণ কোন এক ব্রাহ্মণীকে এই একাদশীব্রতের উপদেশ করেন, ঐ ব্রাহ্মণী মানুষী হয়েও এ একাদশী ব্রত পালন দ্বারা ধনধান্য ও স্বর্গসুখ লাভ করে ছিলেন।”
(১৪)
একাদশ্যাং ভোজনাচ্চ নান্যৎ পাপতরং পরম্ । যানি কানি চ পাপানি ব্রহ্মহত্যাদিকানি চ । অন্নমাশ্রিত্য তান্যেষ তিষ্ঠন্তি হরিবাসরে | সর্ব্বে বর্ণাশ্রমা যাশ্চ স্ত্রিয়শ্চ একাদশীপরাঃ। প্রাপ্নবস্তি গতিং দিব্যামন্যথা পাপমাপুয়ুঃ ॥ #সধবানান্তু নারীণাং রাত্রৌ পেয়ং জলং মতম্ ॥ একাদশ্যাং ন ভুঞ্জীত পক্ষয়োরুভয়োরপি | যনস্থ তিধর্ম্মোহয়ং শুদ্ধমেব সদা গৃহী ॥
[বৃহদ্ধর্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, দশম অধ্যায়, ৩৭]
বঙ্গানুবাদ:
একাদশীতে ভোজন অপেক্ষা পাপকার্য আর নাই কারণ, ব্রহ্মহত্যা প্রভৃতি সমস্ত পাপ একাদশী দিনে অন্নাদি রবিশস্য আশ্রয় করিয়া থাকে। ব্রাহ্মণাদি চারি বর্ণ, ব্রহ্মচারী প্রভৃতি চারি আশ্রমী ও সকল স্ত্রীলোক একাদশী ব্রত পরায়ণ হইলে দিব্যগতি লাভ করে, একাদশী ব্রত না করিলে পাপভাগী হয়। #সধবা নারীরা একাদশী উপবাস করিয়া রাত্রিকালে জলমাত্র পান করিবে। গৃহস্থ ব্যক্তি একাদশীতে উপবাস করিয়া দেবকীনন্দন কৃষ্ণকে ধূপ-দীপাদি দ্বারা পূজা করিবে।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments