বেদোপনিষদে শ্রীকৃষ্ণতত্ত্ব – ১

বেদের প্রতিপাদ্য একমাত্র শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর উপাসনাই জীবের পরম ধর্ম। বেদে তিনি বিভিন্ন নামে কীর্তিত হয়েছেন।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৭/৭, ১৫/১৫) ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বল্লেনঃ
“মত্তঃ পরতরং নান্যৎ কিঞ্চিদস্তি ধনঞ্জয়”।
“বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যঃ বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্”। ইত্যাদি..
( হে ধনঞ্জয় ! আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর কেহ নাই। আমিই সমস্ত বেদের জ্ঞাতব্য, আমিই বেদান্তকর্তা ও বেদবিৎ )
শ্রীগোপাল পূর্বতাপনী উপনিষদ ২১ মন্ত্রে বলেন-
“তস্মাৎ কৃষ্ণ এব পরো দেবস্তং ধ্যায়েৎ।
তং রসেৎ তং ভজেৎ তং যজেৎ।।
একা বশী সর্বগঃ কৃষ্ণ ঈড্য
একোপি সন্ বহুধা যো বিভাতি।
তং পীঠস্থং যে তু ভজন্তি ধীরাস্তেষাং সুখং শাশ্বতং নেতরেষাম্।।”
সেইজন্য শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর, সেই শ্রীকৃষ্ণকেই ধ্যান করিবে, তাঁর নামই সংকীর্তন করবে (সততং কীর্তয়ন্তো মাং) তাঁকেই ভজন করবে, পূজা করবে। সর্বব্যাপী, সর্ববশকর্তা শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র সকলের পূজ্য। তিনি এক হয়েও মৎস-কূর্মাদি, বাসুদেব সঙ্কর্ষণাদি, কারণার্ণব-গর্ভোদকাদি বহুমূর্তিতে প্রকাশমান হন। শুকদেবাদির ন্যায় যে সকল ধীর পুরুষ তাঁর পীঠমধ্যে অবস্থিত শ্রীমূর্তির পূজা করেন, তাঁরাই নিত্য সুখ লাভে সমর্থবান হন।
তত্র কারিকা–
“কৃষ্ণাংশঃ পরমাত্মা বৈ ব্রহ্ম তজ্জ্যোতিরেব চ।
পরব্যোমাধিপস্তস্যৈশ্বর্যমূর্তির্নসংশয়ঃ।।”
শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র সর্বেশ্বর। পরমাত্মা তাঁর অংশ, ব্রহ্ম তাঁর জ্যোতি। পরব্যোমনাথ শ্রীনারায়ণ তাঁরই ঐশ্বর্যবিলাসমূর্তিবিশেষ। এই সিদ্ধান্তে কিছু মাত্র সংশয় নাই ; যেহেতু বেদাদি শাস্ত্র ইহাই নির্দেশ করছেন।
যথা তৈত্তিরীয়ে ২/১/২–
“সত্যং জ্ঞানমনস্তং ব্রহ্ম। যো বেদনিহিতং গুহায়াং পরমে ব্যোমন্। সোঽশ্লূতে সর্বান্ কামান সহ। ব্রহ্মণা বিপশ্চিতেতি।।”
( সত্য স্বরূপে, চিন্ময়, অসীমতত্ত্বই “ব্রহ্ম”। চিত্তগুহায় অন্তর্যামীরূপে অবস্থিত তত্ত্বই ” পরমাত্মা”। পরব্যোমে অর্থাৎ বৈকুণ্ঠে অবস্থিত তত্ত্বই “নারায়ণ”। এই তত্ত্ব যিনি অবগত আছেন, তিনি ” বিপশ্চিৎ ব্রহ্ম” অর্থাৎ পরব্রহ্ম কৃষ্ণের সহিত যাবতীয় কল্যাণ গুণ প্রাপ্ত হন।)
#মহাভারতে শান্তিপর্বে মোক্ষধর্মের ৩২৭ অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন যখন অর্জুন বেদ, পুরাণে ভগবানের যে সকল নাম ( ইন্দ্র, অগ্নি, রুদ্র, বিষ্ণু আদি..), লীলা ঋষিরা উল্লেখ করেছেন তা জানতে চেয়ে।
শ্রীকৃষ্ণ উবাচঃ
“ঋগ্বেদে সযজুর্বেদে তথৈবথর্বসামসু পুরাণে।
সোপনিষদে তথৈব জ্যোতিষে অর্জুন।। ৮।।
সাংখ্যে চ যোগশাস্ত্রে চ আয়ুর্বেদে তথৈব চ।
বহুনি মম নামানি কীর্তিতানি মহার্ষিভিঃ।। ৯।।
গৌণানি তত্র নামানি কর্মজানি চ কানি চিত।
নিরুক্তম কর্মজ্ঞম চ শৃণুস্ব প্রয়াতো অনঘ।।” ১০।।
অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণ বল্লেন হে অর্জুন! ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ, সামবেদ, পুরাণে, উপনিষদে, জ্যোতিষে, সাংখ্যে শাস্ত্রে, যোগশাস্ত্রে, আয়ুর্বেদে ঋষিরা অসংখ্য যেসব নাম উল্লেখ করেছেন, কিছু নাম আমার #স্বরূপ সম্পন্ধিত, কিছু আমার #কার্য্য সম্পর্কিত। হে পাপরহিত অর্জুন ! আমি তোমার কাছে সেই সব নাম ও তাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, তুমি তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করো।
” নরাণাময়নং খ্যাতমঽমেকঃ সনাতনঃ।
আপো নারা ইতি প্রোক্তা আপো বৈ নরসূনবঃ।
অয়নং মম তৎপূর্বমতো নারায়ণো হ্যহম্।।” ৩৭
মুক্তিকালে প্রাণিগণের জীবাত্মার আমিই আশ্রয়স্থান ; এইজন্য এক সনাতন আমিই নারায়ণ। অথবা, নার শব্দের অর্থ জল। যেহেতু জল নরের অর্থাৎ ব্রহ্মের পুত্র। সৃষ্টির পূর্বে সেই নার অর্থাৎ জল আমার আশ্রয় ছিল, এইজন্য আমি নারায়ণ।
“ছাদয়ামি জগদ্বিশ্বং ভূত্বা সূর্য্য ইবাংশুভিঃ।
সর্বভূতাধিবাসশ্চ বাসুদেবস্ততো হ্যহম্।। ৩৮
গতিশ্চ সর্বভূতানাং প্রজনশ্চাপি ভারত!।
ব্যাপ্তা মে রোদসী পার্থ ! কান্তিশ্চাভ্যধিকা মম।।
অধিভূতানি চান্তেষু তদিচ্ছংশ্চাস্মি ভারত !।
ক্রমণাচ্চাপ্যহং পার্থ ! বিষ্ণুরিত্যভিসংজ্ঞিতঃ।।” ৪০
আমি সূর্যের ন্যায় হয়ে কিরণ দ্বারা সমগ্র জগৎ আচ্ছাদন করি, এই জন্য আমি বাসুদেব। অথবা আমি সর্বভূতের বাসস্থান বলে “বাসুদেব”। ভরতবংশীয় পৃথানন্দন ! আমি সর্বভূতের গতি বলে ” বিষ্ণু” ; কিংবা আমা হতেই সর্বভূত উৎপন্ন হয় বলে আমি “বিষ্ণু” ; অথবা আমি স্বর্গ ও মর্ত্য ব্যাপিয়া রয়েছি বলে “বিষ্ণু” কিংবা প্রলয়কালে আমি নিজদেহে সমস্ত ভূত প্রবেশ করাতে ইচ্ছা করি বলে আমি “বিষ্ণু” ; অথবা আমি বামন রূপে সমগ্র জগৎ আক্রমণ করেছিলাম বলে আমি বিষ্ণু নামে অভিহিত হয়ে থাকি।
স্বর্গ, মর্ত্য ও আকাশবর্তী লোকেরা ইন্দ্রিয়দমননিবন্ধন আমাকে লাভ করবার ইচ্ছা করে, সিদ্ধি কামনা করে সেই জন্য আমি “দামোদর”।। ৪১।।
অন্ন, বেদ, জল ও অমৃতকে ” পৃশ্নি” বলা হয়, সেই অন্ন প্রভৃতি সর্বদাই আমার গর্ভে থাকে ; সেই জন্য আমি “পৃশ্নিগর্ভ”।। ৪২।।
একদা একত ও দ্বিত নামক দুই ভ্রাতা ত্রিত নামক কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে কূপমধ্যে নিপাতিত করেছিলেন ; তখন তত্রত্য ঋষিরা আমাকে এইরূপ বলেছিলেন যে, হে পৃশ্নিগর্ভ ! আপনি কূপনিপাতিত ত্রিতকে রক্ষা করুন।। ৪৩।।
তারপর সেই আদিকালে ব্রহ্মার পুত্র ঋষিশ্রেষ্ঠ ত্রিত ” পৃশ্নিগর্ভ” এই নাম কীর্তন করার জন্যই, কূপ হতে উত্থিত হয়েছিলেন।। ৪৪।।
জগতের তাপকারী সূর্য, অগ্নি ও চন্দ্রের যে সকল কিরণ প্রকাশ পায়, সেই গুলিই আমার কেশ। অতএব সর্বজ্ঞ ব্রাহ্মণেরা আমাকে “কেশব” বলেন।।৪৫।।
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments